মানুষ পৃথিবীর যেখানেই বাস করুক না কেন, তার অন্তরের চাহিদা শান্তি, ন্যায়, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে বাস করা। ধর্ম মানুষের এই চিরন্তন চাহিদার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হজরত রাসুল (সা.) প্রতিষ্ঠিত ইসলাম ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার শুধু একটি ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; বরং মানবকল্যাণ, নৈতিক উন্নয়ন এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।আজকের বিশ্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক পরিবারে পরিণত হয়েছে। এক দেশের চিন্তা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ মুহূর্তের মধ্যেই অন্য দেশে পৌঁছে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় ধর্মের সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর শিক্ষা বিশ্ববাসীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কারণ ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা, ভুল ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি অনেক সময় বিদ্বেষ, সহিংসতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা এসব ভুল ধারণা দূর করে মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। মানুষের কাছে শান্তির দূত হজরত রাসুল (সা.)- এর সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি হতে হবে প্রজ্ঞা, উত্তম চরিত্র, সদাচরণ ও সহমর্মিতার মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় আলোচনা করুন।’
(সূরা আন নাহল : আয়াত ১২৫) সুতরাং ধর্ম প্রচারের মূলনীতি হলো জ্ঞান, ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সুন্দর আচরণ; জবরদস্তি বা কঠোরতা নয়।আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধর্ম প্রচারের অন্যতম গুরুত্ব হলো বিশ্বমানবতার মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। সততা, ন্যায়বিচার, দয়া, ক্ষমাশীলতা, সহানুভূতি, মানবসেবা ও আত্মসংযম—এসব মূল্যবোধ সব সমাজেই প্রয়োজন। ধর্ম এসব গুণাবলি বিকাশে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে সহায়তা করে। ধর্ম প্রচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থান নিশ্চিত করা। একে অপরের বিশ্বাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে ভুল বোঝাবুঝি কমে, সংলাপের সুযোগ বাড়ে এবং সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধর্ম প্রচারের সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি বিভিন্ন দেশের শাসকদের কাছে শান্তি ও সত্যের বার্তা সংবলিত পত্র প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর চারিত্রিক সৌন্দর্য, ন্যায়বিচার, দয়া ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। ইসলামের বিস্তারে তাঁর উত্তম চরিত্র ছিল অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধর্ম প্রচারের অনেক কার্যকর মাধ্যম রয়েছে—আন্তর্জাতিক সম্মেলন, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, শিক্ষা ও গবেষণা, বই-পুস্তক প্রকাশ, গণমাধ্যম, টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এসব মাধ্যম যথাযথভাবে ব্যবহার করলে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ধর্মকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থের হাতিয়ার না বানিয়ে মানবকল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে। ভিন্নমতের মানুষের প্রতি সম্মান, শালীন ভাষা, সত্যনিষ্ঠ উপস্থাপন এবং স্থানীয় আইন ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ ধর্ম প্রচারের সাফল্য বৃদ্ধি করে। বর্তমান বিশ্বে আমরা বিভেদ, সংঘাত, অন্যায়, দারিদ্র ও অসমতার মতো অসংখ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি । এই সমস্যাগুলো বিশ্ব সম্প্রদায়ের আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে । অসহিষ্ণু পৃথিবীর ধর্মীয় মৌলবাদিতা দূর করার জন্য মানুষে মানুষে মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। এই অশান্ত বিশ্বে হযরত রাসুল (সা.)-এর শান্তির শিক্ষা কেবল পারে ব্যক্তি, পরিবার সমাজ, রাষ্ট্র তথা গোটা বিশ্বকে শান্তিময় করে তুলতে।। ইসলাম ধর্মের শিক্ষা ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সীমানা অতিক্রম করে জাতি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে উদার মনোভাব, মহানুভবতা ও সমঝোতার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সক্ষম। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক থেকে এবং তোমাদেরকে পরিণত করেছি বিভিন্ন জাতিতে ও বিভিন্ন গোত্রে, যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো।’ ( সূরা হুজুরাত: আয়াত ১৩) ইসলামকে আন্তর্জাতিকীকরণের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সহনশীলতা ও সম্মান প্রদর্শন করা এবং মানুষকে নৈতিকতা, সত্য, ন্যায়, শান্তি ও মানবকল্যাণের পথে আহ্বান করা। প্রজ্ঞা, জ্ঞান, সহিষ্ণুতা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রচার বিশ্বে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বখ্যাত ইসলামিক দার্শনিক ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা (মা. আ.)বিশ্বময় ‘Global Ashek E Rasul (PBUH) Conference’ আয়োজনের মাধ্যমে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরছেন, এটি সত্যিই প্রশংসনীয়।
লেখক: গবেষক, কদর রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা